পরীক্ষণ মনোবিজ্ঞান কি? পরীক্ষণ মনোবিজ্ঞানের সংজ্ঞা,পরিসর ও বিষয়বস্তু আলোচনা কর।
মনোবিজ্ঞানে যতগুলো শাখা আছে তার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে পরীক্ষণ মনোবিজ্ঞান। ১৮৭৯ সালে জার্মান মনোবিজ্ঞানী উইলহেম উন্ড লিপজিগ বিশ্ববিদ্যালয়ে মনোবিজ্ঞানের গবেষণাগার স্থাপন করেন। সেই থেকে পরীক্ষণ মনোবিজ্ঞানের যাত্রা শুরু। একশ বছরের ব্যবধানে এর পরিধি আরো ব্যাপক আকার ধারণ করেছে। দিনকে দিন পরীক্ষণ মনোবিজ্ঞান বিশেষ খ্যাতি অর্জন করছে।
পরীক্ষণ মনোবিজ্ঞান কাকে বলে
মনোবিজ্ঞানের যে শাখা পরীক্ষণ পদ্ধতির সাহায্যে মানুষ ও অন্যান্য প্রাণীর আচরণ সম্বন্ধে তথ্য সংগ্রহ করে তাকে পরীক্ষণ মনোবিজ্ঞান বলে। অর্থাৎ পরীক্ষণ মনোবিজ্ঞান হল পরীক্ষণ পদ্ধতির মাধ্যমে প্রাপ্ত আচরণ সম্পর্কিত তথ্য ও তত্ত্বের সমাহার। পরীক্ষণ মানব অংশগ্রহণকারী এবং প্রাণী সম্পর্কিত বিষয়গুলিকে একটি বিষয় অধ্যয়ন করার জন্য নিযুক্ত করেন, যার মধ্যে রয়েছে সংবেদন, উপলব্ধি, স্মৃতি, জ্ঞান, শেখা, অনুপ্রেরণা, আবেগ; উন্নয়নমূলক প্রক্রিয়া, সামাজিক মনোবিজ্ঞান এবং নিউরাল।
প্রামাণ্য সংজ্ঞাঃ পরীক্ষণ মনোবিজ্ঞান সম্পর্কে নিচে মনোবিজ্ঞানীদের মতামত প্রধান করা হলোঃ
ক্রাইডার ও অন্যান্য (১৯৮৩) বলেন, “পরীক্ষণ মনোবিজ্ঞানের বিশেষত্ব হলো যে ত্রুটি মৌলিক মনোবৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়া যেমন, সংবেদন ও প্রত্যক্ষণ, প্রেষণা ও আবেগ, শিক্ষণ, স্মৃতি এবং পরিজ্ঞান বিবেচনা করে। "
রতিজার এবং অন্যান্যরা (১৯৮৪) বলেন, “পরীক্ষণ মনোবিজ্ঞান ক্ষেত্রকে আওতাভুক্ত করে। যেখানে পেশাদারগণ আচরণ ও মানসিক জীবন অনুধ্যানের পরীক্ষণের উপর একচেটিয়া নির্ভর করে। এটি মূলত আচরণের জৈবিক ভিত্তি। প্রাণী শিক্ষণ এবং আচরণ; এবং জ্ঞানীর প্রক্রিয়াসমূহ (প্রত্যক্ষণ, স্মৃতি, প্রেষণা, চিত্তন) অনুধ্যান অন্তর্ভুক্ত করে।”
পরীক্ষণ মনোবিজ্ঞান একমাত্র পরীক্ষণ পদ্ধতিতে উপাত্ত সংগ্রহ ও উপাত্তের বিশ্লেষণের কাজ সম্পন্ন করে থাকে। এ শাখা আচরণের জৈবিক ভিত্তি, সংবেদন, প্রত্যক্ষণ, শিক্ষণ, স্মৃতি-বিস্মৃতি, চিন্তণ পরিজ্ঞান প্রভৃতি বিষয়ের উপর পরীক্ষণ পরিচালনা করে থাকে।
পরীক্ষণ মনোবিজ্ঞানের বিষয়বস্তু বা পরিসর
নিম্নে পরীক্ষণ মনোবিজ্ঞান যে সব বিষয় নিয়ে আলোচনা করে তা বর্ণনা করা হলো-
১. পরীক্ষণ মনোবিজ্ঞানের বিষয়বস্তু বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে একমাত্র পরীক্ষণ পদ্ধতিকে যথাযথভাবে প্রয়োগ করে থাকে। মনোবিজ্ঞানের অন্যান্য শাখা ও পরীক্ষণ পদ্ধতি ব্যবহার করে। তবে সে সব শাখা পরীক্ষণ পদ্ধতি ছাড়া আরো অনেক পদ্ধতি ব্যবহার করে। পরীক্ষণ পদ্ধতির মধ্যে কিছু শব্দ আছে যথা- চল, অনির্ভরশীল চল, মধ্যবর্তী চল, পরীক্ষণ সংশ্লিষ্ট চল, পরীক্ষণ দল ও নিয়ন্ত্রিত দল প্রভৃতি।
২. পরীক্ষণ মনোবিজ্ঞান পরীক্ষণের সমস্যার বর্ণনা প্রকল্প প্রণয়ন, চলসমূহের সংজ্ঞা প্রদান, পরীক্ষণের নকশা প্রণয়ন, উপাত্য বিশ্লেষণ প্রভৃতি বিষয়সমূহ আলোচনা করে থাকে ।
৩. পরীক্ষণ মনোবিজ্ঞান মানুষ ও অন্যান্য প্রাণীর আচরণের উপর পরীক্ষণ পরিচালনা করে থাকে। বিভিন্ন উদ্দীপকের প্রতি প্রাণী কিভাবে কিরূপ প্রতিক্রিয়া করে তা পরীক্ষণ মনোবিজ্ঞান অনুধ্যান করে। মানুষের আচরণ সম্পর্কে আমরা যে সব সাধারণ সূত্র পেয়েছি তার অধিকাংশই পরীক্ষণ মনোবিজ্ঞানের অবদান।
৪. পরীক্ষণ মনোবিজ্ঞান মনোবিজ্ঞানের মৌলিক প্রক্রিয়া সম্বন্ধে আলোচনা করে থাকে। যেমন-সংবেদন, প্রত্যক্ষণ, প্রেষণা, আবেগ, স্মৃতি-বিস্মৃতি, চিন্তন প্রভৃতি।
৫. পরিবেশ সম্পর্কে মানুষ কিভাবে অভিজ্ঞতা লাভ করে। এবং পরিবেশ কিভাবে মানুষের আচরণের উপর প্রভাব বিস্তার করে। মানুষের ব্যক্তিত্ব কিভাবে বিকশিত হয়, ব্যক্তিত্ব বিকাশে পরিবেশ ও বংশগতির প্রভাব প্রভৃতি বিষয়ের উপর পরীক্ষণ মনোবিজ্ঞান বহু পরীক্ষণ পরিচালনা করে থাকে ।
৬. মনোবিজ্ঞানের প্রায় প্রতিটি বিষয়বস্তুই পরীক্ষণ মনোবিজ্ঞানের পরিসরভুক্ত। এ শাখা বিভিন্ন কৌশলের মাধ্যমে মানসিক প্রক্রিয়ার উপর পরীক্ষণ পরিচালনা করতে সফল হয়েছে।
৭. বর্তমানে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, ক্লিনিক, সরকারি ও বেসরকারি দপ্তর, ব্যবসা ও শিল্প গবেষণা প্রতিষ্ঠান প্রভৃতি ক্ষেত্রে পরীক্ষণ মনোবিজ্ঞানের ব্যাপক বিস্তৃতি ঘটেছে। স্টেপ ও ফুলচার এর পর্যবেক্ষণে দেখা যায় যে, পরীক্ষণ মনোবিজ্ঞানীদের ৭৬.৭% কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়োজিত, হাসপাতাল ও ক্লিনিকে ৬% ব্যবসায় ও সরকারি পর্যায়ে ১৬.৯% এবং অন্যান্য ক্ষেত্রে ০.৩%
উপসংহারঃ পরিশেষে বলা যায় যে, পরীক্ষণ মনোবিজ্ঞান আলোচনার ক্ষেত্র ব্যাপক থেকে ব্যাপকতর হচ্ছে। বর্তমানে সমাজ মনোবিজ্ঞান, শিক্ষা মনোবিজ্ঞান, প্রভৃতি শাখায় পরীক্ষণ মনোবিজ্ঞান অনুপ্রবেশ ঘটেছে। পরীক্ষণ মনোবিজ্ঞান উপাত্ত সংগ্রহের জন্য পরীক্ষণ পদ্ধতিকে ব্যাপকভাবে প্রয়োগ করে থাকে। আধুনিক মনোবিজ্ঞানের মূল উদ্দেশ্য হলো পরীক্ষণ পদ্ধতির মাধ্যমে প্রায় সকল গবেষণা পরিচালনা করা।